বিষাক্ত কয়েলের ছড়াছড়ি মৃত্যু ঝুঁকিতে নগরবাসী

0
6
coil

রাজধানীসহ সারাদেশেই মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে সাধারণ মানুষ অনুমোদনহীন নিম্নমানের মশার কয়েল ব্যবহার করে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এতে শিশুসহ সব বয়সী মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনুমোদনহীন ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর এসব বিষাক্ত মশার কয়েলের নগরীতে রয়েছে ছড়াছড়ি। এসব মশার কয়েল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে অতি মুনাফালোভী এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবদেহের ক্ষতিকারক বিষাক্ত এই কয়েল প্রকাশ্যে নগরীজুড়ে বিক্রি হলেও এসব দেখার যেন কেউ নেই।

এ ব্যপারে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হাসান বলেন, অনুমোদিত এসব কয়েল মানবদেহের জন্য ভয়াবহ ক্ষতিকর। তাছাড়া এটি পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। বিষয়টি যেহেতু পরিবেশ অধিদফতরের বিষয় তাই আমরা এ ব্যাপারে তাদের সঙ্গে আলোচনা করব।

জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দোকানপাটে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে অনুমোদনহীন ও মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর মশার কয়েল। অনুমোদনহীন ওই সব কয়েলের বিষক্রিয়ায় বিকলাঙ্গ, ক্যান্সার, শ্বাসনালীর প্রদাহসহ দীর্ঘমেয়াদী জটিল রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। এমনকি গর্ভের শিশুর বিকলাঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর বাড়তি লাভের আশায় ওই সব কয়েল বিক্রি করছেন দোকানিরা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মশার কয়েলের ধোঁয়ায় থাকা রাসায়নিক, ১৩৭টি সিগারেটে থাকা নিকোটিনের চেয়েও ক্ষতিকর। অনুমোদনহীন এসব কয়েলে ‘অ্যাকটিভ ইনটিগ্রেডিয়েন্ট’ যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে ক্যান্সার, শ্বাসনালীতে প্রদাহসহ বিকলাঙ্গতার মতো ভয়াবহ রোগ হতে পারে।

এমনকি গর্ভের শিশুও এসব ক্ষতির শিকার হতে পারে। খাদ্যে ফরমালিন ও পানিতে আর্সেনিকের প্রভাব যেমন দীর্ঘমেয়াদি, তেমনি এসব কয়েলের বিষাক্ত উপাদান মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের বাসা তৈরি করছে বলে জানান স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা কেন্দ্রের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, এ ধরনের রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার সব বয়সী মানুষের জন্যই ক্ষতিকর। তবে শিশুদের ওপর এটি দ্রুত প্রভাব বিস্তার করে।

তিনি আরো বলেন, প্রতিনিয়ত এ ধরনের রাসায়নিকের সংস্পর্শ তাৎক্ষণিকভাবে নয়, সুদূরপ্রসারী ক্ষতি করে। জটিল রোগব্যাধি সৃষ্টি করে। বিশেষ করে শ্বাসতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে মারাত্মকভাবে।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) মশার কয়েলে সর্বোচ্চ শূন্য দশমিক তিন (০.৩) মাত্রার ‘অ্যাকটিভ ইনটিগ্রেডিয়েন্ট’ ব্যবহার নির্ধারণ করেছে। এই মাত্রা শুধুমাত্র মশা তাড়াতে কার্যকর, মারতে নয়। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, অনুমোদনহীন ব্যবসায়ী মহল কর্তৃক প্রস্তুত ও বাজারজাতকৃত কয়েলে শুধু মশাই নয়, বিভিন্ন পোকামাকড়, তেলাপোকা এমনকি টিকটিকি পর্যন্ত মারা যায়!

মশার কয়েল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসিআই কনজুমার ব্র্যান্ডের নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ আলমগীর হোসেন এ ব্যাপারে বলেন, বাজারে বিষাক্ত মশার কয়েলে সয়লাব হয়ে গেছে এ কথা ঠিক। অভিযোগ আছে, মশার কয়েলে মশা তাড়ানোর পাশাপাশি টিকটিকি পর্যন্ত মরে যায়। জনস্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি পরীক্ষা করতে সীমিত আকারের একটি কমিটি ও সাব-কমিটি থাকলেও কাজে গতি আছে বলে মনে হচ্ছে না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মারাত্মক ক্ষতিকর কয়েল উৎপাদন ও বাজারজাত করছে ২০-২২টি দেশীয় বেনামি কারখানা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসা-বাড়ি ভাড়া নিয়ে কারখানা তৈরি করে ক্ষতিকর এ মশার কয়েল উৎপাদন করা হয়। ভুয়া পিএইচপি নম্বর ও বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করে আকর্ষণীয় মোড়কে এসব কয়েল বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে উচ্চমাত্রার অ্যাকটিভ ইনটিগ্রেডিয়েন্ট সম্পন্ন চায়না কয়েল। এসব কারখানায় যে কোনো ব্র্যান্ডের মশার কয়েল যে কেউ অর্থের বিনিময়ে তৈরি করে নিচ্ছে। এখান থেকে তৈরি মশার কয়েল দেখতে হুবহু আসল মশার কয়েলের মতো। যা কিনে মানুষ প্রতারিত হচ্ছে। দেশের বাজার এসব কয়েলে সয়লাব হলেও এর বিপরীতে সংশ্লিষ্টদের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ নেই বলে অভিযোগ অনুমোদিত দেশীয় কোম্পানিগুলোর। এ ছাড়া বর্তমানে চীন থেকে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের কয়েল আমদানি করা হচ্ছে। এসবেও একই অবস্থা।

বালাইনাশক অধ্যাদেশ (পেস্টিসাইড অর্ডিন্যান্স ১৯৭১ ও পেস্টিসাইড রুলস ১৯৮৫) অনুসারে মশার কয়েল উৎপাদন, বাজারজাত ও সংরক্ষণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। অধ্যাদেশ অনুযায়ী- অধিদফতরের অনুমোদন পাওয়ার পর পাবলিক হেলথ প্রোডাক্ট (পিএইচপি) নম্বর ও বিএসটিআইয়ের অনুমোদন নিয়েই সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বালাইনাশক পণ্য উৎপাদন ও বাজারজাত করার কথা। কিছু অসাধু কোম্পানির প্যাকেটের গায়ে কয়েলে ব্যবহৃত কেমিক্যালের পরিমাণ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত অনুমোদিত মাত্রার উল্লেখ থাকলেও এসব কয়েলে প্রকৃতপক্ষে কেমিক্যাল অনেক বেশিমাত্রায় ব্যবহার করছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী জোটবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিন এসব মশার কয়েল কারখানায় কোনো কেমিস্ট ছাড়াই মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে ভেজাল ও নিম্নমানের মশার কয়েল প্রস্তুত করছে। যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, কদমতলী, শ্যামপুর, নারায়ণগঞ্জ সানারপাড়, সৈয়দপুর, ফতুল্লা কাশীপুরসহ ঢাকার আশপাশের আবাসিক এলাকায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে এসব অনুমোদনহীন মশার কয়েল কারখানা। এসব কারখানায় নেই কোনো সরকারি অনুমোদন। প্রশাসনের নাকের ডগায় অনেক ক্ষতিকর এ মশার কয়েল কারখানা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের একটি কয়েল কারখানার মালিক মো. হাছান বলেন, মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক পদার্থ না দিলে মশা মরে না। তাই বেশি মাত্রায় রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করতে হয়।

এ ব্যাপারে বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক রিয়াজুল হক বলেন, ঢাকা বিভাগের মধ্যে ৩৭টি ব্র্যান্ডের মশার কয়েল তৈরির অনুমোদন রয়েছে তাদের। এ ৩৭ ব্র্যান্ডের বাইরে কেউ কয়েল উৎপাদন করলে তা অবৈধ ও অনুমোদনহীন। তাদের বিরুদ্ধে বিএসটিআই পর্যায়ক্রমে কাজ করছে। শিগগিরই আমরা কিছু অসাধু কয়েল ফ্যাক্টরির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করব।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিএসটিআইয়ের অনুমতি তালিকার বাইরে বাজারে- সেভেন ভোস্টার, সুপার ডিসকভারি, প্যাগোডা গোল্ড, তুলসিপাতা, সেফগার্ড, লিজার্ড মেগা, বস সুপার, টাটা হাইস্পিড, মেট্রো, সুপার জাদু, মারুফ পাওয়ার ম্যাজিক, সোলার, মাছরাঙা মেঘা, বাংলা কিলার, হান্টার, বিচ্ছু, চমক, সুপার যাদু, রকেট ব্র্যান্ডের কয়েল অবাধে বিক্রি হচ্ছে। এসব কয়েলের গায়ে ঢাকা, ভৈরব কিংবা চট্টগ্রাম লেখা থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কোনো ঠিকানা নেই।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, বাজারে যেসব কয়েল পাওয়া যায় তা কতটুকু মাত্রায় ইনটিগ্রেডিয়েন্ট ব্যবহার করা হয় তা এখন আমাদের দেখার বিষয়। এসব কয়েল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে মান যাচাই করার দরকার বলে মনে করেন তিনি। এ ছাড়া দেশের বাইরে থেকে মশার কয়েল আমদানি করার ক্ষেত্রে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গঠনে গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরিচালক (উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং) আবুল কালাম আজাদ বলেন, অধিদফতরের অনুমোদন ছাড়া কেউ কয়েল উৎপাদন করতে পারে না। কিন্তু কিছু কারখানা আমাদের অনুমোদন ছাড়াই কয়েল প্রস্তুত ও বাজারজাত করছে বলে অভিযোগ এসেছে। অভিযোগের ভিত্তিতে আমাদের কাজ চলছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এসিআই ও রেকিট অ্যান্ড বেনকিইজারসহ মশার কয়েল উৎপাদনকারী কয়েকটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাজারে বেশির ভাগ কয়েলই সঠিক প্রক্রিয়ায় মান নিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদিত নয় এবং বিষাক্ত কেমিক্যালযুক্ত যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ধরনের মারাত্মক ক্ষতিকর কয়েল উৎপাদন ও বাজারজাত করছে ৫০-৬০টি দেশি বেনামি কারখানা। ভুয়া পিএইচপি নম্বর ও বিএসটিআইর লোগো ব্যবহার করে আকর্ষণীয় মোড়কে এসব কয়েল বাজারে ছাড়া হচ্ছে। এ ছাড়া বিদেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে উচ্চমাত্রার অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট সম্পন্ন চায়না কয়েল। দেশের বাজার এসব কয়েলে সয়লাব হলেও সংশ্লিষ্টদর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।